Friday, June 24, 2016

সমান্তরাল সরলরেখা

ইংরাজরা দেশছাড়া হয়েছে, সে হোলো প্রায় কয়েক দশক। কিন্তু তারা তাদের পেছনে ফেলে গেছেন তাদের থাকাখাওয়া, চালচলন, আদবকায়দা, পোশাকআশাক, আচার ব্যবহার, আরো কত কি। তবে মাথাব্যাথার কারণ হোলো তাদের আমলের চিরপরিচিত প্রজাতি, মাছি মারা কেরানি, যারা, ইংরাজরা চলে যাওয়ার এতদিন পরেও স্বমহিমায় বর্তমান। না এনারা আজকাল আর মাছি মারেন না কিম্বা কেরানিগিরিও করেন না হয়তো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কুঠুরিতে বোসে জোয়ান চেবান আর বাতেলা দেন। তবে এতে তেনাদের ঐতিহ্য বিন্দুমাত্রও খর্ব হয়না। আজও প্রভু আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে এনাদের জুড়ি মেলা ভার। রাজার মাথার ব্যামো, ওনার ইচ্ছে রাজ্যের প্রজারা সকলে নিজের নিজের মাথায় পাখির ইয়ে মর্দন করুন, তাতে রাজার ব্যামো সারলেও সারতে পারে। ব্যাস ওমনি কেরানির দল সারা রাজ্যের পাখির ইয়ে সংগ্রহে লেগে পড়লেন। এতে দেশের দশের কি লাভ তাতে তাদের কিসসু যায় আসে না।
এনাদের চক্ষু কর্ণ দৃশ্যমান হোলেও তা ব্যবহারের অভাবে নিতান্তই অকার্যকরি। মানুষের ব্যবহার উপযোগী যা কিছু সবই এনাদের অলঙ্কার মাত্র, যা স্থান কাল পাত্র নির্বিশেষে রাজার পায়ে সমর্পণ করতে এনারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। রোজ সকালে বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে এনারা এনাদের মগজ বাক্সবন্দি করে তালা লাগিয়ে নিয়ে এসে রাজার দরবারে জমা দেন। রাজার হুকুম মত সমস্ত বাক্সবন্দি মগজ পুকুরের জলে ফেলে দেওয়া হয়। বাড়ি ফেরার পথে এনারা পুকুরে ডুব দিয়ে এক একটি বাক্স তুলে বাড়ির পথে হাঁটা লাগান। কে কোন বাক্সের মগজ পেলেন এতে তেনাদের কোনো তফাৎ পড়েনা।
সন্ধ্যের অন্ধকারটা সবে ঘনিয়ে আসছে। আলোর রেস ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তরেখা ধরে। কেরানির দল টুপটুপ করে ডুব মারছেন পুকুরের জলে, আর কাদা পাঁক মেখে বাক্সবন্দি মগজ হাতে হাসিমুখে বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছেন। পথের ধারে তাদের দেখে হাসার মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম। এদের দেখে যারা দিব্যি মুখ ফিরিয়ে নিজের নিজের কাজে মন দিচ্ছেন তারা হলেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় বাবুগন। শুধরে দেওয়া তো দূর অস্ত, কাদা পাঁক থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতেই তারা ব্যস্ত। এনারা নিজেদের গা বাঁচিয়ে চলতে এতটাই পটু যে প্রবল বৃষ্টিতেও এনাদের ছাতার প্রয়োজন হয় না, দিব্যি সুট প্যান্ট টাই এঁটে বৃষ্টির ধাঁরা থেকে গা বাঁচিয়ে এঁরা অফিস থেকে বাড়ি আর বাড়ি থেকে অফিস ছুটে বেড়ান। চোখের ওপর ঠুলি আর গায়ে সুগন্ধি আতরে এদের চেনা যায়। খাওয়ার টেবিলে, চায়ের আড্ডায়, তাসের আসরে এরা পৃথিবী উল্টেপাল্টে ফেলেন গলার জোরে। তারপর বাড়ি ফিরে এসে সেই কথাগুলি নস্যির কৌটায় ভরে নাকে দিয়ে ঘুম লাগান। হাঁচির সাথে সাথে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় সমস্ত যুগান্তকারী বক্তব্যের বাস্তবতা।
অগত্যা দুই শ্রেণির মানুষ দুটি সমান্তরাল সরলরেখা বরাবর হেঁটে চলেছেন। সূর্যের আলো, রাতের জ্যোৎস্না, মেঘ বৃষ্টি, আলো বাতাস, সবই এদের কাছে সমানভাবে পৌছলেও, ব্যাবহারগত ভাবে সব আলাদা আলাদা। এঁরা একে ওপরকে লম্বদূরত্বে দেখেন, ভুরু কোঁচকান, মুচকি হাসেন আর নিজের নিজের পথে দিব্যি হাঁটা লাগান লম্বদূরত্ব বজায় রেখে। যতক্ষণ না সামনাসামনি হচ্ছে এভাবেই চলতে থাকে সব। প্রাকৃতিক শারীরিক কিম্বা মানসিক বিকৃতিজনিত কারণে যদি সামনা সামনি হয়ে যায় এই দুই শ্রেণির, সমস্যাটা সেখানেই শুরু। একবাক্স অকার্যকরী মগজ ও হুকুম মানার অদম্য ইচ্ছা আর একবাক্স নৈরাশ্যের সম্মুখসমরে জয় পরাজয় নির্বিশেষে ক্ষয় হয় সমাজ, ক্ষয় হয় এত শতাব্দী ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা মানব সভ্যতার।
কোন সরলরেখা ধরে হাঁটবো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ব্যাস্ত,সবাই। কিন্তু তার আগে একবার ভেবে দেখলে ভালো হয়, সরলরেখা গুলি কি সত্যিই সরল, নাকি আমাদের সীমিত দর্শন এবং স্তিমিত মগজাস্ত্রের অত্যাল্প আস্ফালনের কারণে আমরা আমাদের চারিপাশের ক্রমচক্রায়িত গ্রন্থিবদ্ধ বাস্তব থেকে বিমুখ।

No comments:

Post a Comment