Sunday, June 19, 2016

লুকোচুরি

ক্লাসটা শেষ হোতে তখনো অনেকটা সময় বাকি। রসায়নের গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিডে তখন মন ডুবিয়ে দিয়েছি। হঠাৎ গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিডের তেজে মনটা গলে যেতে শুরু করলো। কিছুটা মন সালফেট হয়ে অধঃক্ষিপ্ত হোলো আর বাকিটা জলের সাথে মিশে ছুটে বেড়াতে লাগলো বিশ্ব ব্রম্মান্ডে। যাবতীয় ক্ষারকিয়, মেঘ বৃষ্টি, প্রেম ভালবাসা, মাঠ ময়দান, ধ্যান ধারনা, সবকিছুর সাথে বিক্রিয়া শুরু হোলো। জমে উঠতে লাগলো স্মৃতির ওপর স্মৃতির অধঃক্ষেপ। আর আছড়ে পড়তে লাগলো একটার পর একটা ঢেউ মনের কিনারে। ক্লাস শেষ হোলো, স্কুল ছুটি হোলো কিন্তু সালফিউরিক অ্যাসিডের প্রভাব গেল না মন থেকে। স্কুল থেকে ফিরছি। চারিদিকে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, বৃষ্টিও পড়ছে সামান্য। কাদামাখা রাস্তা বেয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে চলেছি। হঠাৎ আমার নাম ধরে কে যেন ডাকছে মনে হোলো। আধভেজা একটা কাগজ আমার হাতে গুঁজে দিয়ে যে মেয়েটা আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না, তাকে রোজ দেখি, কিন্তু তার এই বৃষ্টিমাখা আলোআঁধারি রূপ এর আগে দেখেছি বোলে মনে হোলো না। সে যে পথ দিয়ে ছুটে গেলো সেই পথের দিকে কতক্ষণ যে তাকিয়ে ছিলাম, কোন কোন ভাবনার জগতে যে বিচরণ কোরে বেড়িয়েছি, তার হিসাব শুধু গাঢ় সালফিউরিক অ্যাসিডে ডুব দিলে পাওয়া যাবে। যখন বাস্তবে ফিরলাম, আমার হাতের কাগজটা আমার হাতেই ডেলা পাকিয়ে গেছে। অ্যাসিড ভেজা মনটা, সে যেন ক্ষার মিশিয়ে লবণাক্ত কোরে দিয়ে গেলো। কিজানি আজ হয়তো অন্যদিনের মতই মেয়েটি তার বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মাতবে, কিম্বা হয়তো আমার মতই ভাবনার জগতে বিচরণ করবে, যদি আরেকবার দেখা হয়ে যায় ভাবনার জগতে সেই আশায়। বাড়ি ফিরেছি বেশ খানিকক্ষণ হোলো। বৃষ্টি ভেজা জামাকাপড়, কাদামাখা জুতো এখনো আমায় জড়িয়ে। সেই মুহূর্তের সবকিছুই আঁকড়ে ধরে রাখতে ইচ্ছে করছে। বেশ কয়েকবার মায়ের বকুনি খেয়েছি ইতিমধ্যে। সামনের টেবিলে মুড়ির বাটিটা যেই-কে-সেই। আমি যেন মুড়ির বাটিতে ঢুকে পড়েছি। একেকটা মুড়ির আড়ালে আড়ালে লুকোচুরি খেলছি আর অপেক্ষা কোরে আছি, কেও পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরবে আর বলবে, ধাপ্পা। মায়ের তীব্র বকুনির জেরে, ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে আলমারি থেকে শুকনো গরম জামাকাপড় বের করতে আলমারি খুলে জামাটা যেই বের করতে যাবো, অমনি কে যেন জামাকাপড়ের আড়ালে টুকি বোলে ডেকে উঠলো। মনকে আর আটকে রাখা গেল না। এবার ডুব দিলাম রঙ বেরঙ্গের জামাকাপড়ের সমুদ্রে। যে জামাকাপড় গুলো রোজ ঘামে বৃষ্টিতে ভিজে ছুঁড়ে ফেলি, ফুটবলের মাঠে কাদায় গড়াগড়ি খাই, আজ যেন হঠাৎ সেই জামাকাপড় গুলো খুব প্রিয় হয়ে উঠেছে। আলতো হাতে একটার পর একটা জামা সরিয়ে সরিয়ে দেখতে লাগলাম আর খুঁজতে লাগলাম তাকে। বইখাতা খুলে বসেছি। হঠাৎ বই থেকে সব যেন ডানা মেলে বেরিয়ে পড়তে লাগলো। জ্যামিতির আকার, ক্যালকুলাসের হিজিবিজি, সুদাসলের টাকা পয়সা, ঐকিক নিয়মের দেওয়াল রাস্তা মাঠ শ্রমিক সব যেন ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনো সমাকলন এর দাঁড়ি আমার মাথায় গাঁট্টা মেরে যাচ্ছে তো কখনো ঐকিক নিয়মের শ্রমিক আমার চুল টেনে বর্গমূলের নিচে লুকিয়ে পড়ছে। সারাটা সন্ধ্যে, সারাটা রাত, এভাবেই লুকোচুরি খেলে গেলাম কতরকম ভাবে। লুকোচুরি খেলতে খেলতে কখন যে ঘুমের দেশে ঢলে পড়েছিলাম খেয়াল নেই। পরের দিন সকালে ওঠা থেকে ভুলেই গেছিলাম আগের দিনের কথা। দিব্যি রোজের মতন স্নান খাওয়া পড়া, স্কুলের শুকনো জামাকাপড়, জুতো মোজা, মায়ের হাতের গরম ভাত, সব কিছুই ছিল সাধারণ। বাড়ি থেকে বেরোতে যাবো, হঠাৎ একটা ফোন। ফোনের ওদিকে বিল্টুদা, আমাদের স্কুলের সিনিয়র। :- কাল আমি স্কুলে যাইনি। বোনের হাতে রসায়ন এর স্যারের নাম্বার টা পাঠিয়েছিলাম। স্যার বোল্লেন তুই নাকি ফোন করিসনি। :- দাদা কাগজটা বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, তুমি আমাকে নাম্বার টা বোলে দাও আমি লিখে নি।
সালফিউরিক অ্যাসিডের ছোঁওয়া যে কতটা বিপজ্জনক তা টের পেলাম ঠিকই, তবুও অধঃক্ষিপ্ত স্মৃতিগুলো আজও তরতাজা। তাই সালফিউরিক অ্যাসিড আজও আমার প্রিয়, আজও আমার প্রিয় শব্দ টুকি, আর আজও আমার প্রিয় খেলা লুকোচুরি।

No comments:

Post a Comment